Skip to main content

হিন্দুধর্মের ইতিহাস

হিন্দুধর্মের ইতিহাস


৯ শতক থেকে ২১ শতক পর্যন্ত হিন্দু শিল্পকর্ম এবং মন্দির

হিন্দুধর্মের ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে ।[১] এটি লৌহ যুগ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মের বিকাশের সাথে মিলে যায়, এর কিছু ঐতিহ্য প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম যেমন ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত । হিন্দুধর্মকে এজন্য বিশ্বের "প্রাচীনতম ধর্ম" বলা হয়।[১১] পণ্ডিতরা হিন্দুধর্মকে বিভিন্ন উৎস থেকে উদ্ভুত ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ হিসাবে মনে করেন, যার একক প্রতিষ্ঠাতা নেই।[১২][১৩][১৪][১২][১৩][১৫][১৬][১৭][২৫] এই হিন্দু সংমিশ্রণ বৈদিক যুগের পরে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০[১৩] - ২০০[২৬] এবং ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে,[১৩] দ্বিতীয় নগরায়নের সময়কালে এবং হিন্দুধর্মের ধ্রুপদী যুগের শুরুর দিকে আবির্ভূত হয়, যখন মহাকাব্য এবং প্রথম পুরাণ রচিত হয়েছিল।[১৩][২৬]

হিন্দুধর্মের ইতিহাস প্রায়শই বিকাশের সময়কালে বিভক্ত। প্রথম সময়কাল হল প্রাক-বৈদিক যুগ, যার মধ্যে সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা এবং স্থানীয় প্রাক-ঐতিহাসিক ধর্ম রয়েছে, যা প্রায় ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শেষ হয় । খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ এর মধ্যে কোনো সময়ে ইন্দো-আর্য অভিবাসনের সাথে ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মের প্রবর্তন শুরু হয় এবং উত্তর ভারতে বৈদিক যুগের সূচনা হয়।[২৭][৩০]

খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর পর ধীরে ধীরে ভারতে বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটলে বৈদিক ধর্মের নবজাগরণের রূপে ধ্রুপদি হিন্দুধর্মের উত্থান ঘটে।[৩১] খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে সাংখ্যযোগন্যায়বৈশেষিকমীমাংসা ও বেদান্ত – হিন্দু দর্শনের এই ছয়টি প্রধান শাখার উদ্ভব ঘটে । এই সময়টি হিন্দুধর্মের “স্বর্ণযুগ” বলে পরিচিত যা গুপ্ত সাম্রাজ্যের সমসাময়ীক। ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে একই সময়ে শৈব ও বৈষ্ণব মতবাদের মত একেশ্বরবাদী সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে ।

মোটামুটিভাবে ৬৫০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পর ধ্রুপদী পৌরাণিক হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠালাভ করে মধ্যযুগে। আদি শংকরের অদ্বৈত বেদান্ত মতবাদও এই সময় প্রচারিত হয়। উক্ত মতবাদ বৈষ্ণব ও শৈব মতবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এবং স্মার্তধর্মের উত্থান ঘটায়। এর ফলে দর্শনের অবৈদান্তিক শাখাগুলির অবলুপ্তি ঘটে।

১২০০[৩২] থেকে ১৭৫০[৩৩] খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হিন্দু ও ইসলামী উভয় শাসকের অধীনে হিন্দুধর্ম ভক্তি আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য দেখা যায়, যা আজও প্রভাবশালী রয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে বিভিন্ন হিন্দু সংস্কার আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটে যা আংশিকভাবে পশ্চিমা আন্দোলন, যেমন একতাবাদ এবং থিওসফি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের ফলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব হয়। বিংশ শতাব্দীতে, ভারতীয় প্রবাসীদের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের পরম সংখ্যায় বৃহত্তম সম্প্রদায়ের সাথে সমস্ত মহাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুরা গঠিত হয়েছে।

হিন্দু নামোৎপত্তি

[সম্পাদনা]

ঐতিহ্যগত ভাবে হিন্দু ধর্মSanatan Dharm[৩৪] বা চিরস্থায়ী ধর্ম এবং Arya Dharm[৩৫] বা সুগুণাবলির ধর্ম নামে সুপরিচিত ছিল৷ হিন্দু শব্দটি ফার্সী Hindoostan হিন্দোস্তান (ফার্সি:هندوستان) নামের সাথে সম্পর্কিত৷ হিন্দোস্তান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে হিন্দের স্থান বা ভূমি[৩৬] ঐতিহাসিক দের মতে, হিন্দু শব্দটি সিন্ধু শব্দের পরিবর্তিত রূপ৷ ১২ তম শতাব্দীতে ফার্সী ভাষী তুর্কি আক্রমণ ও তদক্রম শাসন ব্যবস্থায় হিন্দোস্তান নামটির প্রসার ঘটে৷ বৃটিশ কলোনিয়াল সরকারের সময় Hinduism বা হিন্দুধর্ম নামে একটি একক ধর্মীয় পরিচয়ের বিস্তৃতি ঘটে৷[৩৭]

হিন্দুধর্মের ভিত্তিমূল

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক কালক্রম থেকে যদিও হাজার হাজার বছরের একটি বংশবৃত্তান্ত পাওয়া যায়, পণ্ডিতগণ হিন্দুধর্মকে বিভিন্ন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ [৩৮][note ১] বা সংশ্লেষণ [৩৯][note ২] হিসেবে বিবেচনা করেন। ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্ম রয়েছে এর মূলে, [১৮][৪০] যা ইতিমধ্যেই "ইন্দো-আর্য এবং হরপ্পা সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি সংমিশ্রণ"-এর ফসল এবং তা উত্তর ভারতে লৌহ যুগের কুরু রাজ্যের ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং মতাদর্শে বিকশিত হয়েছিল।[৪১][note ৩] কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের শ্রমণ[২৪] বা ত্যাগী ঐতিহ্য[১৮] এবং মেসোলিথিক এবং ভারতের নব্যপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতি, যেমন সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম, দ্রাবিড় ঐতিহ্য, এবং স্থানীয় ঐতিহ্য এবং উপজাতীয় ধর্ম।

এই হিন্দু সংমিশ্রণ বৈদিক যুগের পরে, ৫০০ [১৩] - ২০০ [২৬] খ্রিস্টপূর্ব এবং ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে[১৩] দ্বিতীয় নগরায়নের সময়কালে এবং হিন্দুধর্মের ধ্রুপদী যুগের শুরুর দিকে আবির্ভূত হয়, যখন মহাকাব্য এবং প্রথম পুরাণ রচিত হয়েছিল।[১৩][২৬] এই ব্রাহ্মণ্যবাদী সংমিশ্রণ, স্মৃতি সাহিত্যের মাধ্যমে শ্রামণিক ও বৌদ্ধ প্রভাব এবং উদীয়মান ভক্তিবাদী ঐতিহ্যকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উন্নতির প্রভাবে এই সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটে। গুপ্ত শাসনামলে প্রথম পুরাণ রচিত হয়েছিল, যা "প্রাক-শিক্ষিত ও উপজাতীয় গোষ্ঠীর মধ্যে মূলধারার ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করতে ব্যবহৃত হয়েছিল।" ফলস্বরূপ পুরাণিক হিন্দুধর্ম, ধর্মশাস্ত্রের পূর্ববর্তী ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং স্মৃতিগুলির থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দুধর্ম বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে সহাবস্থানের ফলে অষ্টম শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম সমস্ত স্তরে উচ্চতর অবস্থান লাভ করে।

তৎকালীন সময়ের শাসকশ্রেণী ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি গ্রহণের ফলে উত্তর ভারত থেকে এই "হিন্দু সংমিশ্রণ", এবং এর সামাজিক বিভাজন দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় শাসকের দ্বারা প্রদত্ত জমিতে ব্রাহ্মণদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে সুপরিচিত অ-বৈদিক দেবতাদের অন্তর্ভুক্তি এবং আত্তীকরণ ও সংস্কৃতীকরণের প্রক্রিয়াতে সহায়তা করা হয়, যার ফলে "উপমহাদেশ জুড়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনকে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে"। সংস্কৃতির এই আত্মীকরণ প্রক্রিয়াটি ভারতের স্থানীয় ঐতিহ্যের বিস্তৃত বৈচিত্র্যকে "ধারণাগত অখণ্ডতার জীর্ণ বস্ত্রে অর্ধ আবৃত" হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

এলিয়ট ডয়েচের মতে, ব্রাহ্মণরা এই সংমিশ্রণের বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল। তারা দ্বিভাষিক এবং দ্বি-সাংস্কৃতিক ছিল, তাদের আঞ্চলিক ভাষা এবং প্রসিদ্ধ সংস্কৃত ভাষা উভয়ই কথা বলত, যা সংস্কৃতি এবং ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক পার্থক্য অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা গ্রাম্য সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে মূলধারার সংস্কৃতি এবং মূলধারার সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে গ্রাম্য সংস্কৃতি রূপান্তর করতে সক্ষম ছিল, যার ফলে স্থানীয় সংস্কৃতিটি একটি বৃহত্তর সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ হয়। বৈদিক এবং অল্প পরিমাণে স্মার্তরা ঐতিহ্যবাহী বৈদিক শিক্ষায় আস্থার কারণে একটি নতুন ব্রাহ্মণ্যবাদের উদ্ভব হয়, যা লৌকিক ও আঞ্চলিক দেবতাদের উদ্দেশ্যে স্তুতি রচনা করে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে ওঠে।

যুগ বিভাজন

[সম্পাদনা]

জেমস মিল, তার দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (১৮১৭) বইতে ভারতের ইতিহাসের তিনটি পর্যায়কে আলাদা করেছেন, যথা: হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ সভ্যতা। এই সময়কালের সমালোচনা করা হয়েছে এবং ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে। আরেকটি পর্যায়ক্রম হল "প্রাচীন, ধ্রুপদী, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক যুগে বিভাজন", যদিও এই সময়কালের সমালোচনাও হয়েছে।[৪২]

রোমিলা থাপার উল্লেখ করেন যে ভারতীয় ইতিহাসের হিন্দু-মুসলিম-ব্রিটিশ সময়কালের বিভাজন "শাসক রাজবংশ এবং বিদেশী আক্রমন"কে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়,[৪৩] সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসকে উপেক্ষা করে যা প্রায়ই একটি শক্তিশালী ধারাবাহিকতা দেখায়।[৪৩] প্রাচীন-ধ্রুপদী-মধ্যযুগীয়-আধুনিক বিভাজনটি অষ্টম এবং চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে যে মুসলিম-বিজয় সংঘটিত হয়েছিল তা এই সত্যটিকে উপেক্ষা করে, যদিও দক্ষিণ ভারত কখনই পুরোপুরি জয় করা হয়নি। থাপারের মতে, "সামাজিক ও অর্থনৈতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের" উপর ভিত্তি করেও একটি পর্যায়ক্রম তৈরি হতে পারে, যা শাসকের ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে কঠোরভাবে সম্পর্কিত নয়।[৪৪][note ৪]

স্মার্ট এবং মাইকেলস মিলের পর্যায়করণ অনুসরণ করে বলে মনে হয়, যখন বন্যা এবং মুয়েস "প্রাচীন, ধ্রুপদী, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক সময়কাল" অনুসরণ করে। একটি বিস্তৃত সময়কাল নিম্নরূপ হতে পারে:[২৭]

  • প্রাক-ঐতিহাসিক এবং সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সাল পর্যন্ত);
  • বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১৭৫০-৫০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত);
  • "দ্বিতীয় নগরায়ন" (আনুমানিক ৬০০-২০০ খ্রিস্টপূর্ব);
  • সাধারণ পর্যায় (আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্ব-১২০০ খ্রিস্টাব্দ);[note ৫]
    • প্রাক-শাস্ত্রীয় সময়কাল (আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্ব - ৩০০ খ্রিস্টাব্দ);
    • ভারতের "স্বর্ণযুগ" (গুপ্ত সাম্রাজ্য) (আনুমানিক ৩২০-৬৫০ খ্রিস্টপূর্ব);
    • শেষ-শাস্ত্রীয় সময়কাল (আনুমানিক ৬৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ);
  • মধ্যযুগীয় সময়কাল (আনুমানিক ১২০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দ);
  • প্রারম্ভিক আধুনিক সময়কাল (আনুমানিক ১৫০০-১৮৫০খ্রিস্টাব্দ);
  • আধুনিক সময়কাল (ব্রিটিশ রাজ এবং স্বাধীনতা) (আনুমানিক ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে)।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস

দক্ষিণ এশিয়া
 প্রস্তর যুগ৭০,০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব
• মেহেরগড়৭০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব
• হরপ্পা ও মহেঞ্জদর সভ্যতা৩৩০০-১৭০০খ্রীষ্টপূর্ব
• হরপ্পা সংস্কৃতি১৭০০-১৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব
বৈদিক যুগ১৫০০-৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব
লৌহ যুগ১২০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব
• ষোড়শ মহাজনপদ৭০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব
• মগধ সাম্রাজ্য৫৪৫খ্রীষ্টপূর্ব
• মৌর্য সাম্রাজ্য৩২১-১৮৪খ্রীষ্টপূর্ব
• মধ্যকালীন রাজ্যসমূহ২৫০ খ্রীষ্টপূর্ব
• চোল সাম্রাজ্য• ২৫০খ্রীষ্টপূর্ব
• সাতবাহন সাম্রাজ্য• ২৩০খ্রীষ্টপূর্ব
• কুষাণ সাম্রাজ্য৬০-২৪০ খ্রীষ্টাব্দ
• বাকাটক সাম্রাজ্য২৫০-৫০০ খ্রীষ্টাব্দ
• গুপ্ত সাম্রাজ্য২৮০-৫৫০ খ্রীষ্টাব্দ
• পাল সাম্রাজ্য৭৫০-১১৭৪ খ্রীষ্টাব্দ
• রাষ্ট্রকুট৭৫৩-৯৮২
• ইসলামের ভারত বিজয়৭১২
• সুলতানী আমল১২০৬-১৫৯৬
• দিল্লি সালতানাত১২০৬-১৫২৬
• দক্ষিণাত্য সালতানাত১৪৯০-১৫৯৬
• হৈসল সাম্রাজ্য১০৪০-১৩৪৬
• কাকতীয় সাম্রাজ্য১০৮৩-১৩২৩
• আহমন সাম্রাজ্য১২২৮-১৮২৬
বিজয়নগর সাম্রাজ্য১৩৩৬-১৬৪৬
মুঘল সাম্রাজ্য১৫২৬-১৮৫৮
মারাঠা সাম্রাজ্য১৬৭৪-১৮১৮
শিখ রাষ্ট্র১৭১৬-১৮৪৯
শিখ সাম্রাজ্য১৭৯৯-১৮৪৯
ব্রিটিশ ভারত১৮৫৮–১৯৪৭
ভারত ভাগ১৯৪৭
স্বাধীন ভারত১৯৪৭–বর্তমান
জাতীয় ইতিহাস
বাংলাদেশ • ভুটান • ভারত
মালদ্বীপ • নেপাল • পাকিস্তান • শ্রীলঙ্কা
আঞ্চলিক ইতিহাস
আসাম • বেলুচিস্তান • বঙ্গ
হিমাচল প্রদেশ • উড়িষ্যা • পাকিস্তানের অঞ্চল সমূহ
পাঞ্জাব • দক্ষিণ ভারত • তিব্বত
বিশেষায়িত ইতিহাস
টঙ্কন • রাজবংশ • অর্থনীতি ভারততত্ত্ব
• ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস • সাহিত্য • নৌসেনা
• সেনা • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি • সময়রেখা

প্রাক-বৈদিক ধর্ম (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সাল পর্যন্ত)

[সম্পাদনা]

প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম

[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মের ভিত্তিমূলটি মেসোলিথিক প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম থেকে উদ্ভুত হতে পারে, যেমন ভীমবেটক শিলা আশ্রয় গহ্বরের শিলা চিত্রকর্মে তা প্রমাণিত হয়, যেগুলো প্রায় ১০,০০০ বছর পুরানো (আনুমানিক ৮,০০০ খ্রিস্টপূর্ব), একই সাথে নব-প্রস্তরযুগের সময়। অন্তত এই আশ্রয়গহ্বরগুলির মধ্যে কিছু গহ্বরে ১০০,০০০ বছর আগেও বসতি স্থাপন হয়েছিল। কয়েকটি উপজাতীয় ধর্ম এখনও বিদ্যমান রয়েছে, যদিও তাদের রীতিনীতি প্রাগৈতিহাসিক ধর্মের অনুরূপ নাও হতে পারে।

সিন্ধু সভ্যতা (আ. ৩৩০০–১৭০০ খ্রিস্টপূর্ব)

[সম্পাদনা]

সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা (৩৩০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; পূর্ণবর্ধিত কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের[৪৫] পশ্চিমাঞ্চলে[৪৬][৪৭] অবস্থিত সিন্ধু নদ অববাহিকা।[n ১] প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। পরে তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-হকরা নদী উপত্যকা[৫১] ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত।[৫২][৫৩] বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং বালোচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তর্গত ছিল।

ব্রোঞ্জযুগীয় সিন্ধু সভ্যতায় ভারতের প্রাগৈতিহাসিক ধর্মের নানা নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। এই সভ্যতার ধর্মবিশ্বাসে হিন্দুধর্মের অনুরূপ কিছু ধর্মীয় প্রথার সন্ধান মেলে। যেমন, কিছু সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত সীলমোহরে স্বস্তিক চিহ্ন পাওয়া যায়, যা বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ধর্মেও রয়েছে। হরপ্পার অবশিষ্ট অংশে অনেক পরে হিন্দু শিবলিঙ্গ হিসাবে ব্যাখ্যা করা ফলিক চিহ্নগুলি পাওয়া গেছে।[৫৪][৫৫] অনেক সিন্ধু উপত্যকার সীলমোহরে প্রাণীর চিত্র পাওয়া যায়। মহেঞ্জোদাড়োয় খননকার্য চালানোর সময় একটি সীলমোহর পাওয়া যায়,[৫৬] যেখানে একটি উপবিষ্ট পশুপরিবৃত এবং শিংযুক্ত ব্যাক্তির চিত্র লক্ষিত হয়।[৫৭][৫৮][৫৯] এটিকে শুরুর দিকের খননকারীরা "পশুপতি" নামকরণ করেন।[৬০][৬১] পশুপতি হচ্ছে হিন্দু দেবতা শিব এবং রুদ্রের একটি উপাধি। কোনো কোনো গবেষক এই মূর্তিতে হাঁটু মুড়ে কোলের উপর হাত রেখে বসার ভঙ্গিটির সঙ্গে যোগভঙ্গিমার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। সিলমোহরটির আবিষ্কর্তা স্যার জন মার্শালও এটিকে শিবের এক আদিরূপ বলে বর্ণনা করেছেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তাঁরা এই মূর্তির বসার ভঙ্গিটিকে বলেছেন "যোগভঙ্গিমা"। ১৯৯৭ সালে লেখা, ডরিস মেথ শ্রীনিবাসন বলেন, "সাম্প্রতিক অনেক গবেষণায় সীলমোহরের চিত্রটিকে "প্রোটো-শিব" বলা যায় না, যার মধ্যে তিনটি মাথা রয়েছে, যে কারণে মার্শালের প্রোটো-শিব বৈশিষ্ট্যের ধারণাগুলি প্রত্যাখ্যান করা হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে জন মার্শাল মুখমণ্ডলের যা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তা মানুষের মতো নয় বরং গবাদি পশুর অনুরূপ, সম্ভবত তিনি এক ঐশ্বরিক বৃষ-মানব হিসাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইরাভাথাম মহাদেবনের মতে, তার সিন্ধু লিপির শব্দকোষ The Indus Script: Texts, Concordance and Tables (১৯৭৭), এর ৪৭ এবং ৪৮ প্রতীক , যা উপবিষ্ট মানুষের মতো ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে, দক্ষিণ ভারতীয় দেবতা মুরুগণকে বর্ণনা করতে পারে।

সিন্ধু উপত্যকায় প্রচুর সংখ্যক মূর্তি পাওয়া যায়, কিছু পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে হরপ্পার লোকেরা উর্বরতার প্রতীক একটি মাতৃকা দেবীর উপাসনা করতো, যা আজও গ্রামীণ হিন্দুদের মধ্যে একটি সাধারণ অভ্যাস। অনেকেই এই বিশ্বাসের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন।[৬২] এস ক্লার্ক এই ধারণাটিকে বিতর্কিত করেছে, তিনি সেসব মূর্তিগুলিকে অনেকগুলি মূর্তির কার্যকারিতা এবং নির্মাণের অপর্যাপ্ত ব্যাখ্যা হিসাবে দেখেন।

বৈদিক যুগ (আ. ১৭৫০–৫০০ খ্রিস্টপূর্ব)

[সম্পাদনা]
দেবনাগরীতে লিখিত ঋগ্বেদ (পদপাঠ) পাণ্ডুলিপি; ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লিখিত।

বৈদিক ধর্ম ছিল প্রাচীন সানতনীদের বেদনির্ভর পবিত্র একটি ধর্ম। ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইরানীয় মালভূমি থেকে হিন্দুকুশ হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশে যায়।[৬৯] এরাই বৈদিক ধর্মের সূচনা করেন এবং বেদগ্রন্থ রচনা করেন।[৭০]

হিন্দুধর্মের আদিতম ধর্মগ্রন্থ চার বেদ – ঋক্সামযজুঃ ও অথর্ব। এগুলির মধ্যে ঋগ্বেদ প্রাচীনতম। ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থগুলি রচিত হয়। পল্লব ও গুপ্তযুগ পর্যন্ত এগুলি গুরুশিষ্য পরম্পরায় মৌখিক প্রথার মাধ্যমে প্রচলিত ছিল। এর পর থেকে মৌখিক প্রথার সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করার প্রথাও চালু হয়।

আনুষ্ঠানিক বাসন, হরপ্পান, ২৬০০-২৪৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ

দ্রাবিড়ীয় লৌকিক ধর্ম

[সম্পাদনা]

প্রাচীন দ্রাবিড় ধর্ম হিন্দু ধর্মের একটি অ-বৈদিক রূপ গঠন করেছিল যে তারা ঐতিহাসিকভাবেই ছিল বা বর্তমানে আগমীয়। আগমসমূহ মূলত বৈদিক নয়,[৭১] এবং তা বৈদিক-উত্তর পরবর্তী গ্রন্থ,[৭২] বা প্রাক-বৈদিক রচনা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।[৭৩] আগম হল তামিল ও সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থের একটি সংগ্রহ যা মূলত মন্দির নির্মাণ ও মূর্তি তৈরির পদ্ধতি, দেবদেবীদের উপাসনা, দার্শনিক মতবাদ, ধ্যানমূলক অনুশীলন, ছয়গুণ আকাঙ্ক্ষা অর্জন এবং চার ধরনের যোগব্যায়ামের গঠন।[৭৪] হিন্দু ধর্মে রক্ষাকারী দেবতা, পবিত্র উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের উপাসনা পূর্ব-বৈদিক দ্রাবিড় ধর্মের বেঁচে থাকার পন্থা হিসাবেও স্বীকৃত।[৭৫] প্রথম দিকের বৈদিক ধর্মে দ্রাবিড় ভাষাগত প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলি বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যে প্রাচীনতম জ্ঞাত ইন্দো-আর্য ভাষায় উপস্থিত রয়েছে, ঋগ্বেদের ভাষা (আ. ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব), এতে দ্রাবিড় থেকে নেওয়া এক ডজনেরও বেশি শব্দও রয়েছে। দ্রাবিড় প্রভাবের জন্য ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী হয় যখন আমরা সংহিতা থেকে পরবর্তী বৈদিক রচনার মধ্য দিয়ে এবং শাস্ত্রীয়-বৈদিক পরবর্তী সাহিত্যে প্রবেশ করে।[৭৬] এটি প্রাচীন দ্রাবিড় এবং ইন্দো-আর্যদের মধ্যে একটি প্রাথমিক ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ[৩৮][note ১] বা সংশ্লেষণের প্রতিনিধিত্ব করে যা ভারতীয় সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছিল।[৭৭][২১][৭৮][৭৯]



পূর্ববর্তী বৈদিক যুগের সাধারণভাবে প্রস্তাবিত সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের দিকে নির্দেশ করে।[৮০] বৈদিক ধর্ম ছিল শুরুর দিকের ইন্দো-আর্যদের বলিদানের ধর্ম, প্রাথমিক প্রাচীন ভারতীয় উপভাষার বক্তারা, শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ যুগের প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় জনগণ থেকে উদ্ভূত যারা মধ্য-এশীয় স্তেপে বাস করত।[৮১]

উৎসসমূহ

[সম্পাদনা]

কুরু রাজ্যের ইন্দো-আর্যদের বৈদিক ধর্মের নামানুসারে নামকরণ করা[৮২][৮৩] বৈদিক যুগ ১৭৫০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।[২৭][৮৪] ইন্দো-আর্যরা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের একটি শাখা, অনেক পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে মধ্য এশিয়ার স্তেপের কুর্গান সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।[৮৫][৮৬][৮৭][৮৮] প্রকৃতপক্ষে, নির্দিষ্ট কিছু দেবতার নাম সহ বৈদিক ধর্ম মূলত প্রাচীন গ্রীক, রোমান, পার্সিয়ান এবং জার্মানীয় জনগণের মতো একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি শাখা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, বৈদিক দেবতা দৌস্ পিতা হল প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় দেবতা *Dyēus ph2ter (বা সহজভাবে *ডায়াস) এর একটি রূপ, যেখান থেকে গ্রীক জিউস এবং রোমান জুপিটারও এসেছে। একইভাবে বৈদিক মনু এবং যম প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় *Manu এবং *Yemo থেকে উদ্ভূত, যা থেকে জার্মানীয় Mannus এবং Ymir উদ্ভূত হয়েছে।

ইন্দো-ইউরোপীয় অভিবাসন তত্ত্ব অনুসারে, ইন্দো-ইরানীয়রা ছিল ইন্দো-আর্য এবং প্রোটো-ইরানীয়দের সাধারণ পূর্বপুরুষ। ১৮০০-১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ইন্দো-ইরানীয়রা ইন্দো-আর্য এবং ইরানীদের মধ্যে বিভক্ত হয়।[৮৫]

ইন্দো-আর্যরা ছিল পশুপালক[৮৯] যারা সিন্ধু সভ্যতার পতনের পর উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলে এসেছিল,[২৭][১৫][১৩][৯০] ইন্দো-আর্যরা ছিল ইন্দো -ইরানীয়দের একটি শাখা।, যা বর্তমান উত্তর আফগানিস্তানের ব্যাক্টরিয়া - মার্জিয়ানা যুগে আন্দ্রোনোভো সংস্কৃতিতে [৮৫] উদ্ভূত হয়েছিল। [৮৫] এই সংস্কৃতির শিকড়গুলি আবার সিন্তাষ্ট সংস্কৃতিতে ফিরে যায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বলি যা ঋগ্বেদের বলিদানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সমান্তরাল দেখায়। [৮৫]

যদিও সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার শিল্পে দেবতাদের কিছু প্রারম্ভিক চিত্র আবির্ভূত বলে মনে হয়, বৈদিক যুগে ইন্দো-আর্য অভিবাসনের সময়কাল থেকে খুব কম ধর্মীয় নিদর্শন অবশিষ্ট রয়েছে। [৯১] এটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে প্রাথমিক বৈদিক ধর্ম কেবলমাত্র "বিস্তৃত বলিদানের মাধ্যমে প্রকৃতির প্রাথমিক শক্তির" উপাসনার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল, যা নৃতাত্ত্বিক উপস্থাপনাগুলিকে সহজে ধার দেয়নি। [৯১] [৯২] বিভিন্ন প্রত্নবস্তু কপার হোর্ড সংস্কৃতির (সিই ২য় সহস্রাব্দ) অন্তর্গত হতে পারে, তাদের মধ্যে কিছু নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পরামর্শ দেয়। [৯৩] এই নিদর্শনগুলির সঠিক তাৎপর্য বা এমনকি সংস্কৃতি এবং সেগুলি যে সময়কালের অন্তর্গত ছিল তা নিয়ে ব্যাখ্যাগুলি পরিবর্তিত হয়। [৯৩]

প্রারম্ভিক বৈদিক যুগে (সি. 1500 - 1100 খ্রিস্টপূর্বাব্দ [৮৯] ) ইন্দো-আর্য উপজাতিরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে যাজক ছিল। [১৪] 1100 খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর, লোহার প্রবর্তনের সাথে, ইন্দো-আর্য উপজাতিরা পশ্চিম গাঙ্গেয় সমভূমিতে চলে আসে, একটি কৃষিভিত্তিক জীবনধারাকে অভিযোজিত করে। [৮৯] [১৪] [৯৪] প্রাথমিক রাষ্ট্র-রূপ আবির্ভূত হয়, যার মধ্যে কুরু -উপজাতি এবং রাজ্য ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। [৮৯] [১৪] এটি ছিল একটি উপজাতীয় ইউনিয়ন, যা 1000 খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নথিভুক্ত রাষ্ট্র-স্তরের সমাজে পরিণত হয়েছিল। [৮৯] এটি প্রাথমিক বৈদিক যুগের তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে চূড়ান্তভাবে পরিবর্তিত করে, তাদের আচার-অনুষ্ঠানগুলিকে বেদ-সংগ্রহে সংগ্রহ করে এবং নতুন আচার-অনুষ্ঠানের বিকাশ ঘটায় যা ভারতীয় সভ্যতায় গোঁড়া শ্রুত আচার হিসেবে তাদের অবস্থান লাভ করে, [৮৯] যা এতে অবদান রাখে। যাকে বলা হয় "শাস্ত্রীয় সংশ্লেষণ" [১৪] বা "হিন্দু সংশ্লেষণ"[১৩]

ঋগ্বেদীয় ধর্ম

[সম্পাদনা]

বেদ হল প্রাচীন ভারতে লিপিবদ্ধ একাধিক গ্রন্থের একটি বৃহৎ সংকলন। ছান্দস্ ভাষায় রচিত বেদই ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন এবং সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ[৯৫][৯৬] বৈদিক ঋষিরা মৌখিক প্রথার শিষ্যদের বেদ শিক্ষা দিতেন বলে একে শ্রুতি বলা হয়। পাশ্চাত্যের অনেক গবেষক ভাষাগত রচনাশৈলি, প্রত্নতাত্তিক প্রমাণাদির উপর নির্ভর করে বেদের রচনাকাল ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হিসাবে ধারণা করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বেদে মোট মন্ত্র সংখ্যা ২০৩৭৯টি। বেদের সংখ্যা চার: ঋগ্বেদযজুর্বেদসামবেদ ও অথর্ববেদ[৯৭][৯৮] এদের মধ্যে ঋগ্বেদ হচ্ছে সর্বপ্রাচীন। প্রত্যেকটি বেদ আবার চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: সংহিতা (মন্ত্র ও আশীর্বচন), ব্রাহ্মণ (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও যজ্ঞাদির উপর টীকা), আরণ্যক (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম, যজ্ঞ ও প্রতীকী যজ্ঞ) ও উপনিষদ্‌ (ধ্যান, দর্শন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সংক্রান্ত আলোচনা)।[৯৭][৯৯][১০০]

মহাজাগতিক ধারা

[সম্পাদনা]

উপনিষদ

[সম্পাদনা]

উপনিষদ (সংস্কৃতउपनिषद्হিন্দুধর্মের এক বিশেষ ধরনের ধর্মগ্রন্থের সমষ্টি । এই বইগুলিতে হিন্দুধর্মের তাত্ত্বিক ভিত্তিটি আলোচিত হয়েছে । উপনিষদের অপর নাম বেদান্ত । ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, উপনিষদ্‌গুলিতে সর্বোচ্চ সত্য স্রষ্টা বা ব্রহ্মের প্রকৃতি এবং মানুষের মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের উপায় বর্ণিত হয়েছে । উপনিষদ্‌গুলি মূলত বেদ-পরবর্তী ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক[১০১] অংশের শেষ অংশে পাওয়া যায় । এগুলি প্রাচীনকালে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত ছিল।

উপনিষদ্‌ সাধারণভাবে "বেদান্ত" নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যাত হয় "বেদের শেষ অধ্যায়সমূহ বা শেষাংশ" হিসেবে। আবার বিকল্প একটি অর্থও করা হয়ে থাকে। সেটি হল "বেদের বিধেয় বা সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য" এছাড়া উপনিষদ সংখ্যা হল ১০৮ টি তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপনিষদ ১২টি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ঐতরেয়, কঠ, কেন, ছান্দোগ্য, ঈশ, বৃহদারণ্যক, শ্বেতাশ্বতর, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডূক্য উপনিষদ।[১০২] ব্রহ্ম (পরম সত্য) ও আত্মা (ব্যক্তির অন্তর্নিহিত সত্ত্বা) উপনিষদের মূল উপজীব্য বিষয়[১০৩][১০৪] এবং "তুমিই যে সেই আত্মা, তা জানা"ই হল গ্রন্থাবলির মূল বক্তব্য।[১০৪][১০৫] ভগবদ্গীতা ও ব্রহ্মসূত্রের সঙ্গে মুখ্য উপনিষদ্‌গুলি (এই তিন শাস্ত্র একত্রে প্রস্থানত্রয়ী নামে পরিচিত)[১০৬] পরবর্তীকালের একাধিক বৈদান্তিক দার্শনিক গোষ্ঠীর ভিত্তি স্থাপন করে। এগুলির মধ্যে হিন্দুধর্মের দু’টি প্রভাবশালী অদ্বয়বাদী ধারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[note ৬][note ৭][note ৮]

ঐতিহাসিকদের মতে, মুখ্য উপনিষদ্‌গুলি প্রাক্‌-বৌদ্ধ যুগ থেকে[১০৯][১১০] শুরু করে খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমার্ধ্ব পর্যন্ত[১১০] সুদীর্ঘ সময়কালের বিভিন্ন পর্বে রচিত হয়। অপর দিকে অপ্রধান উপনিষদগুলি মধ্যযুগ ও প্রাক্‌-আধুনিক যুগের রচনা।[১১১] অবশ্য প্রতিটি উপনিষদের সঠিক রচনাকাল নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ কবি মার্টিন সেমোর-স্মিথ উপনিষদ্‌গুলিকে "সর্বকালের ১০০টি সবচেয়ে প্রভাবশালী বই"-এর তালিকাভুক্ত করেছেন।[১১২] আর্থার শোপেনহাওয়ার, রালফ ওয়াল্ডো এমারসন ও হেনরি ডেভিড থোরো সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপনিষদ্‌গুলির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। গবেষকেরা উপনিষদের দর্শনের সঙ্গে প্লেটো ও কান্টের দর্শনের মিল খুঁজে পান।[১১৩][১১৪]

ব্রাহ্মণ্যবাদ

[সম্পাদনা]
বৈদিক যুগে উত্তর ভারতের মানচিত্র। বৈদিক শাখাগুলির অবস্থান সবুজ রঙে ও থর মরুভূমি কমলা রঙে চিহ্নিত।

বৈদিক যুগের ধর্ম (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে ৫০০ অব্দ[১১৫]) (অথবা বৈদিক ধর্ম, বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা প্রাচীন হিন্দুধর্ম[note ৯] বা, প্রাচীন ভারতের প্রেক্ষাপটে, ব্রাহ্মণ্যধর্ম[note ১০]) হল আধুনিক হিন্দুধর্মের আদি রূপ। ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্ম ও আধুনিক হিন্দুধর্মের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়।[note ১১]

চার বেদের মন্ত্র অংশে বেদের অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি রক্ষিত আছে। এই অংশটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত। ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন পুরোহিতেরা। পূজার পদ্ধতি আধুনিক হিন্দুধর্মে অনেকাংশে অপরিবর্তিত থাকলেও, রক্ষণশীল শ্রৌতদের একটি অংশ এখনও মৌখিকভাবে স্তোত্র শিক্ষার পরম্পরা বজায় রেখেছে।

দ্বিতীয় নগরায়ন ও ব্রাহ্মণ্যবাদের পতন (আ. ৬০০-২০০ খ্রিস্টপূর্ব)

[সম্পাদনা]

উপনিষদ ও শ্রমণ আন্দোলন

[সম্পাদনা]

মৌর্য সাম্রাজ্য

[সম্পাদনা]

মৌর্য্য সাম্রাজ্য (সংস্কৃতमौर्यसाम्राज्यम्প্রাচীন ভারতে লৌহ যুগের একটি বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য ছিল। মৌর্য্য রাজবংশ দ্বারা শাসিত এই সাম্রাজ্য ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বদিকে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমতলভূমিতে অবস্থিত মগধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র[১১৯][১২০]

মৌর্য্য সাম্রাজ্য তৎকালীন যুগের অন্ততম বৃহত্তম সাম্রাজ্য হিসেবে পরিগণিত হত, শুধু তাই নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় সাম্রাজ্য কখনো তৈরী হয়নি।[১২১][১২২] ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য নন্দ রাজবংশ উচ্ছেদ করে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তারপর মহান আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগে নিজ সামরিক শক্তিবলে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের আঞ্চলিক রাজ্যগুলিকে জয় করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যেই গ্রীক সত্রপগুলিকে পরাজিত করে মৌর্য্য সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ উত্তর-পশ্চিম ভারত জুড়ে বিস্তৃত হয়।[১২৩] বর্তমান যুগের মানচিত্রের নিরিখে এই সাম্রাজ্য উত্তরে হিমালয়, পূর্বে অাসাম, পশ্চিমে বালুচিস্তান ও হিন্দুকুশ পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।[১২৩] চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও বিন্দুসার এই সাম্রাজ্যকে দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত করেন এবং অশোক কলিঙ্গ রাজ্য জয় করে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। অশোকের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে মগধে শুঙ্গ রাজবংশের উত্থান ঘটে।

ব্রাহ্মণ্যবাদের পতন

[সম্পাদনা]

বৈদিক প্রথার পুনর্জাগরণ

[সম্পাদনা]

হিন্দু সংশ্লেষণ এবং ধ্রুপদী হিন্দু ধর্ম (আ. ২০০ খ্রিস্টপূর্ব - ১২০০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

প্রাক-শাস্ত্রীয় হিন্দুধর্ম (খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ - ৩২০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

স্মৃতি

[সম্পাদনা]

স্মৃতি (সংস্কৃতस्मृति, IAST: Smṛti), বা সোজাসুজি ভাবে "যা মনে রাখা হয়", হচ্ছে ঐতিহ্যগতভাবে রচিত কিন্তু ক্রমাগত সংশোধিত এক প্রকার হিন্দু শাস্ত্র যা একটি নির্দিষ্ট লেখক দারা রচিত হয়েছে বলে নির্দেশ করে এবং যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মুখেমুখে প্রাচারিত এবং সংশোধিত হয়েছিলো।[১২৪]  স্মৃতিকে সাধারণত অমৌলিক কাজ বলে ধরা হয় এবং হিন্দু দর্শনের মীমসঞ্জন শাখা বাদে অনান্য শাখায় স্মৃতিকে শ্রুতির তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয়। [১২৫]

স্মৃতি সাহিত্য হচ্ছে বিভিন্ন বৈচিত্রময় গ্রন্থের এক বিশাল সংকলন। এই সংকলনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, যা ছয় বেদাঙ্গ (বেদের ঐচ্ছিক চর্চা) সীমাবদ্ধা নয়, মহাকাব্য ( মহাভারত ও রামায়ণ), ধর্মসূত্র এবং ধর্মশাস্ত্র (বা স্মৃতিশাস্ত্রসমূহ), অর্থশাস্ত্র, বিভিন্ন পুরাণ, কাব্য বা কবি সাহিত্য, ব্যাপক ভাষ্য বা ব্যাখ্যা (বিভিন্ন শ্রুতি ও অ-শ্রুতি গ্রন্থের পর্যালোচনা ও মন্তব্য),এবং রাজনীতি, নৈতিকতা (নীতিশাস্ত্র), সংস্কৃতি, শিল্প ও সমাজ সম্পর্কে ব্যাপক নিবন্ধ(সারসংক্ষেপ)।[১২৬][১২৭]

প্রত্যেক স্মৃতি পাঠকে বিভিন্ন সংস্করনে ও বিভিন্ন ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় হিন্দু ঐতিহ্যের মধ্যে স্মৃতিকে সবচেয়ে অবাধ বলে ধারণা করা হয় যা যে কেউ লিখতে বা পুনর্বিন্যস্ত করতে পারতো।[১২৮]

হিন্দু দর্শন

[সম্পাদনা]

হিন্দু দর্শন বলতে বোঝায় প্রাচীন ভারতে উদ্ভূত একগুচ্ছ দর্শনের একটি সমষ্টি। মূল ধারার হিন্দু দর্শনের মধ্যে ছয়টি আস্তিক দার্শনিক শাখা (ষড়দর্শন) বিদ্যমান। এগুলি হল: সাংখ্যযোগন্যায়বৈশেষিকমীমাংসা ও বেদান্ত[১২৯] প্রাচীন বেদকে জ্ঞানের প্রামাণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস রূপে সাধারণরূপে স্বীকার করা হয় ব'লে এ ষড়দর্শনকে আস্তিক দর্শনও বলা হয়।।[১৩০][note ১২] প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে আরও কয়েকটি দার্শনিক শাখার উদ্ভব ঘটেছিল যেগুলি বেদকে অস্বীকার করে কিছুটা একই ধরনের দার্শনিক ধারণা প্রচার করেছিল। এগুলিকে নাস্তিক দর্শন বলা হয়।[১২৯][১৩০] ভারতীয় নাস্তিক দর্শনগুলি হল: বৌদ্ধধর্মজৈনধর্মচার্বাকআজীবক ও অন্যান্য।[১৩২]

সঙ্গম সাহিত্য

[সম্পাদনা]

সঙ্গম সাহিত্য ধ্রুপদী তামিল সাহিত্যের একটি অংশ। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত[১৩৩][১৩৪][১৩৫] এই সাহিত্যধারা ৪৭৩ জন কবির রচিত ২৩৮১টি কবিতার এক সংকলন। এই কবিদের মধ্যে ১০২ জনের পরিচয় জানা যায় না।[১৩৬] এই কবিতাগুলি যে সময়কালে রচিত হয় সেই সময়কালটিকে সাধারণভাবে সঙ্গম যুগ নামে অভিহিত করা হয়। সাহিত্য গবেষকদের মতে সহস্রাধিক বছর বিদ্যমান সঙ্গম কিংবদন্তির নামানুসারে এই সমগ্র সাহিত্যবর্গটি নামাঙ্কিত। [১৩৭][১৩৮][১৩৯] সঙ্গম সাহিত্যের বিষয়বস্তু ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এর উপজীব্য ছিল তামিল জাতির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা বিবরণ।[১৪০]

সঙ্গম সাহিত্যকারেরা ছিলেন তামিল কবি। তাদের মধ্যে ছিলেন সমাজের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির পুরুষ ও মহিলারাও। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংকলনে সংকলিত ও সম্পাদিত হয়ে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এই কবিতাগুলি। পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা হারালেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে সি ডব্লিউ তামোতারামপিল্লাই ও ইউ ভি স্বামীনাথ আয়ার প্রমুখ পণ্ডিত কর্তৃক পুনরাবিষ্কৃত হয় এগুলি।

ভারতের "স্বর্ণযুগ" (গুপ্ত ও পল্লব সময়কাল) (আ. ৩২০-৬৫০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

গুপ্ত ও পল্লব সাম্রাজ্য

[সম্পাদনা]

গুপ্ত সাম্রাজ্য (সংস্কৃত: गुप्त राजवंश, Gupta Rājavaṃśa) ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল।[১৪১] মহারাজ শ্রীগুপ্ত ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।[১৪২] গুপ্ত শাসকদের সময়/শাসনামলে ভারতে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়। গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ[১৪৩] এই যুগ ছিল আবিষ্কারবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবাস্তুবিদ্যাশিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্যগণিতজ্যোতির্বিদ্যাধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ; বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল।[১৪৪] গুপ্ত যুুগের আমলে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি যেমন কালিদাসআর্যভট্টবরাহমিহিরবিষ্ণু শর্মা -এর অবির্ভাব হয়েছিলো। প্রথম চন্দ্রগুপ্তসমুদ্রগুপ্ত ও সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ সম্রাট তার সাম্রাজ্য সীমা দক্ষিণ ভারতেও প্রসার লাভ করে।

পল্লব সাম্রাজ্য দক্ষিণ ভারতের একটি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্য। খ্রিস্টীয় ২য় থেকে ৯ম শতাব্দী পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর পল্লবদের উত্থান ঘটে। পল্লব শাসকেরা আগে সাতবাহন সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সামন্ত রাজা ছিলেন।[১৪৫][১৪৬] এদের উৎস সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।

ধ্রুপদী-পরবর্তী হিন্দুধর্ম - পৌরাণিক হিন্দুধর্ম (আ. ৬৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক হিন্দুধর্ম

[সম্পাদনা]
অষ্টমাতৃকা-সহ দেবী অম্বিকা (দুর্গা) রক্তবীজ দৈত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত; দেবীমাহাত্ম্যম্মার্কণ্ডেয় পুরাণের পুথিচিত্র

পুরাণ (সংস্কৃতपुराण purāṇa, "প্রাচীনযুগীয়") হিন্দুবৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ আখ্যানমূলক ধর্মগ্রন্থ-সমুচ্চয়। পুরাণে সৃষ্টি থেকে প্রলয় পর্যন্ত ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস, রাজন্যবর্গ, যোদ্ধৃবর্গ, ঋষি ও উপদেবতাগণের বংশবৃত্তান্ত এবং হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব, দর্শন ও ভূগোলতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে।[১৪৭] পুরাণে সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো দেবতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং তাতে ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তার প্রাবল্যও লক্ষিত হয়। এই গ্রন্থগুলি প্রধানত আখ্যায়িকার আকারে রচিত, যা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

লোকমতে, মহাভারত-রচয়িতা ব্যাসদেব পুরাণসমূহের সংকলক।[১৪৮] যদিও পুরাণের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন পাঠগুলি গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টীয় তৃতীয়-পঞ্চম শতাব্দী) সমসাময়িক। এর অধিকাংশ উপাদানই ঐতিহাসিক বা অন্যান্য সূত্রাণুযায়ী এই সময়কাল ও তার পরবর্তী শতাব্দীগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত। পুরাণগ্রন্থগুলি ভারতের নানা স্থানে রচিত হয়েছিল। পুরাণের সামগ্রিক পাঠে কিছু সাধারণ ধারণা লক্ষিত হয়; কিন্তু একটি পুরাণের উপর অপর আরেকটি পুরাণের প্রভাব অন্বেষণ দুঃসাধ্য। তাই সাধারণভাবে এগুলিকে সমসাময়িক বলেই ধরে নেওয়া হয়।.[১৪৯]

লিখিত পাঠ্যগুলির রচনাতারিখ পুরাণের প্রকৃত রচনাতারিখ নয়। কারণ একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে পূর্ববর্তী এক সহস্রাব্দ কাল ধরে এই কাহিনিগুলি মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়ে আসে। এবং পরবর্তীকালে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এগুলির আকার ও রূপ পরিবর্তিত হতে দেখা যায়।[১৫০]

কাশীর মহারাজা ডক্টর বিভূতি নারায়ণ সিংহের পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধানে অল ইন্ডিয়া কাশীরাজ ট্রাস্ট গঠিত হলে পুরাণ নিয়ে সুসংহত গবেষণার কাজ শুরু হয়। এই সংস্থা থেকে পুরাণের সমালোচনামূলক সংস্করণ এবং পুরাণম্ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে।[১৫১]

ভক্তি আন্দোলন

[সম্পাদনা]

ভক্তি আন্দোলন মধ্যযুগীয় হিন্দু ধর্মে বিস্তার লাভ করা আস্তিক্যবাদী ভক্তিমূলক প্রবণতাকে বোঝায়[১৫২] এবং পরবর্তীতে শিখ ধর্ম গঠনে অনুঘটক হিসাবে কাজ করে।[১৫৩] এটি অষ্টম শতাব্দীর দক্ষিণ ভারতে (বর্তমানে তামিলনাড়ু এবং কেরালা) থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং উত্তর দিকে ছড়িয়ে পড়ে।[১৫২] এটি ১৫শ শতাব্দীর পর থেকে পূর্ব এবং উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৫শ শতাব্দীর এবং ১৭শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে। [১৫৪]

অদ্বৈত বেদান্ত

[সম্পাদনা]

অদ্বৈত বেদান্ত (সংস্কৃত: अद्वैत वेदान्त) বা অদ্বৈতবাদ হল বৈদিক দর্শনের সর্বেশ্বরবাদী [১৫৫][১৫৬][১৫৭][১৫৮] ধর্মচর্চার সাধন-পদ্ধতিগত একটি ধারা ।[web ২]সর্বেশ্বরবাদী এ মতে, মানুষের সত্যিকারের সত্ত্বা আত্মা হল শুদ্ধ চৈতন্য[note ১৩] এবং পরম সত্য ব্রহ্মও শুদ্ধ চৈতন্য।[১৬০] এ মতে উপনিষদগুলির একটি সামগ্রিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।[১৬১] অদ্বৈত বেদান্তের প্রধান ব্যাখ্যাকর্তা হলেন আদি শঙ্কর[১৬২] তবে তিনি এই মতের প্রবর্তক নন। পূর্বপ্রচলচিত অদ্বৈতবাদী মতগুলিকে তিনি সুসংবদ্ধ করেছিলেন।[১৬৩]

অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রথম ঐতিহাসিক প্রবক্তা গৌড়পাদের ধ্যানস্থ ভঙ্গীর মূর্তি। ইনি আদি শঙ্করের গুরু গোবিন্দ ভাগবতের গুরু। কথিত আছে, গৌড়পাদই শ্রীগৌড়পাদাচার্য মঠের প্রতিষ্ঠাতা।

পাশ্চাত্য প্রাচ্যবাদ ও দীর্ঘস্থায়ী দর্শন মতের প্রভাব, এবং ভারতের নব্য-বেদান্ত মত ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের উপর অদ্বৈত বেদান্তের প্রভাবের জন্য[১৬৪] অদ্বৈত মতকে হিন্দু দর্শনের বেদান্ত[note ১৪] শাখা ও সেগুলির সাধনপদ্ধতিগুলির[১৬৫] মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী[১৬৬] ও শক্তিশালী[১৬৭][১৬৮] মত মনে করা হয়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে অদ্বৈতবাদী শিক্ষার প্রভাব দেখা যায়।[১৬৯] ভারতীয় সংস্কৃতির বাইরেও অদ্বৈত বেদান্ত হিন্দু অধ্যাত্মবিদ্যার একটি সাধারণ উদাহরণ বলে বিবেচিত হয়।[১৬৪]

বেদান্তের প্রতিটি শাখারই প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল প্রস্থানত্রয়ী (উপনিষদ্‌ভগবদ্গীতা ও ব্রহ্মসূত্র)। অদ্বৈত মতে, এই বইগুলির দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।[১৬১]

[note ১৫] [note ১৬] অদ্বৈত অনুগামীরা আত্মা ও ব্রহ্ম জ্ঞান সংক্রান্ত বিদ্যা[১৭১] বা জ্ঞানের সাহায্যে মোক্ষ লাভ করতে চান। এই মোক্ষ লাভ একটি দীর্ঘকালীন প্রয়াস। গুরুর অধীনে থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এটি লাভ করা সম্ভব।

আদি শঙ্কর (সংস্কৃতआदिशङ्करः) (৭৮৮-৮২০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন একজন ভারতীয় দার্শনিক। ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত বেদান্ত নামের শাখাটিকে তিনি সুসংহত রূপ দেন।[১৭২][১৭৩] তার শিক্ষার মূল কথা ছিল আত্ম ও ব্রহ্মের সম্মিলন। তার মতে ব্রহ্ম হলেন নির্গুণ[১৭৪]

আদি শঙ্কর অধুনা কেরল রাজ্যের কালাডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সারা ভারত পর্যটন করে অন্যান্য দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের দার্শনিক মতটি প্রচার করেন। তিনি চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মঠগুলি অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের ঐতিহাসিক বিকাশ, পুনর্জাগরণ ও প্রসারের জন্য বহুলাংশে দায়ী। শঙ্কর নিজে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে খ্যাত।[১৭৩] এছাড়া তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীদের দশনামী সম্প্রদায় ও হিন্দুদের পূজার সন্মত নামক পদ্ধতির প্রবর্তক।

সংস্কৃত ভাষায় লেখা আদি শঙ্করের রচনাবলির প্রধান লক্ষ্য ছিল অদ্বৈত তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা। সেযুগে হিন্দু দর্শনের মীমাংসা শাখাটি অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার উপর জোর দিত এবং সন্ন্যাসের আদর্শকে উপহাস করত। আদি শঙ্কর উপনিষদ্‌ ও ব্রহ্মসূত্র অবলম্বনে সন্ন্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উপনিষদ্‌, ব্রহ্মসূত্র ও ভগবদ্গীতার ভাষ্যও রচনা করেন। এই সব বইতে তিনি তার প্রধান প্রতিপক্ষ মীমাংসা শাখার পাশাপাশি হিন্দু দর্শনের সাংখ্য শাখা ও বৌদ্ধ দর্শনের মতও খণ্ডন করেন।[১৭৪][১৭৫][১৭৬]

মধ্যযুগীয় এবং প্রথম দিকে আধুনিক সময়কাল (আ. ১২০০-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

মুসলিম শাসন

[সম্পাদনা]

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম বিজয় শুরু হয় প্রধানত ১২শ থেকে ১৬শ শতাব্দীতে। তবে ৮ম শতাব্দীতে মুসলমানেরা রাজপুত সাম্রাজ্যে (বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে) কিছু কিছু হামলা চালিয়েছিল। দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম উপমহাদেশের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয় করেন যা ছিল তৎকালে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে উত্তর প্রান্ত।

১৪ শতকে খিলজি বংশের, আলাউদ্দিন খিলজি তার সাম্রাজ্যের সীমানা দক্ষিণে গুজরাত,রাজস্থান ও দাক্ষিণাত্য মালভূমি এবং তুগলক রাজবংশ তাদের সীমানা তামিলনাড়ু পর্যন্ত বাড়ায়। কিন্তু দিল্লি সালতানাত ভেংগে গেলে ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে অনেক গুলো নতুন সালতানাতে আবির্ভাব ঘটে, যার মধ্যে গুজরাত সালতানাতমালওয়া সালতানাত, তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্য পথের অধিকারী বাংলা সালতানাত[১৭৭][১৭৮]

মারাঠা সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ রাজত্বের পূর্বে মুসলিম মুঘল সাম্রাজ্য ভারতের অধিকাংশ রাজ্যকে দখল বা দমন করতে সক্ষম হয়। তবে কিছু প্রান্তিক রাজ্য তারা দখল করতে পারেনি, যেমন - হিমালয়ের উপরাংশে হিমাচল প্রদেশউত্তরখণ্ডসিকিমনেপাল ও ভুটান; দক্ষিণ ভারতে ট্রাভাঙ্কর ও তামিলনাড়ু এবং পূর্বে আসামের আহোম সাম্রাজ্য

হিন্দু ধর্ম একীকরণ

[সম্পাদনা]

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ খ্রিঃ – ১৫৩৩ খ্রিঃ) ছিলেন পূর্ব এবং উত্তরভারতের এক বহু লোকপ্রিয় বৈষ্ণব সন্ন্যাসী ও ধর্মগুরু এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। তিনি গৌড়বঙ্গের নদিয়া অন্তর্গত নবদ্বীপে (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা) হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত শ্রীজগন্নাথমিশ্র ও শ্রীমতী শচীদেবীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[১৮০] বৈষ্ণব সমাজে তাঁকে শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুুুগল প্রেমাবতার বলে মনে করা হয়।[১৮১] শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে ভক্তিযোগ ভাগবত দর্শনের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা ও প্রচারক।[১৮২] তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণের রূপে পরম সত্ত্বার উপাসনা প্রচার করেন এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পর্যন্ত শ্রীহরি নাম ও ভক্তি এবং হরেকৃষ্ণ হরেরাম মহামন্ত্র যাহা শ্রীকলিসন্তরন উপনিষদের ও শ্রীপদ্মপুরাণের হরপার্বতী সংবাদে উল্লেখিত মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন।

মহামন্ত্র
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।[১৮৩][১৮৪]

রামানুজ (১০১৭-১১৩৭) ছিলেন একজন ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক। তিনি শ্রী রামানুচার্যউপাধ্যায়লক্ষ্মণ মুনি নামেও পরিচিত। সাধারণভাবে হিন্দুরা তাকে হিন্দু দর্শনের বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্তের প্রধান ব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে দেখেন।[১৮৫]

বৈষ্ণব আচার্য রামানুজাচার্যের শিষ্য রামানন্দ । যার শিষ্য ছিলেন কবির ও সুরদাস। রামানুজ বেদান্ত‌ দর্শনের উপর ভিত্তি করে তাঁর নতুন দর্শন বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্ত রচনা করেছিলেন।বেদান্ত‌ ছাড়াও রামানুজাচার্য সপ্তম-দশম শতকের মরমী ও ভক্ত আলওয়ার সাধুদের ভক্তি দর্শনের এবং দক্ষিণের পঞ্চরাত্র ঐতিহ্যের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।

মধ্ব (সংস্কৃতमध्वाचार्यःসংস্কৃত উচ্চারণ: [məd̪ʱʋɑːˈtʃɑːrjə]) বা আনন্দতীর্থ বা পূর্ণ প্রাজ্ঞ (১২৩৮-১৩১৭) ছিলেন হিন্দু দর্শনের তত্ত্ববাদ দ্বৈত বেদান্তের প্রধান প্রবক্তা। তিনি ভক্তি আন্দোলনের সময়কালীন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ছিলেন।

পূর্ব গঙ্গা এবং সূর্য রাজ্য

[সম্পাদনা]

পূর্ব গঙ্গা ও সূর্য ছিল হিন্দু ধর্ম-শাসিত অঞ্চল, যা বর্তমান ওড়িশার বেশিরভাগ রাজত্ব করেছিল (ঐতিহাসিকভাবে কলিঙ্গ নামে পরিচিত) একাদশ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত শাসন করে। ১৩শ এবং ১৪শ শতাব্দীর সময়কালে, যখন ভারতের বিশাল অংশগুলি মুসলিম শক্তির অধীনে ছিল, তখন একটি স্বাধীন কলিঙ্গ রাজ্য হিন্দু ধর্ম, দর্শন, শিল্প এবং স্থাপত্যের একটি শক্তিশালী দুর্গে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব গঙ্গার শাসকরা ধর্ম ও কলা শিল্পের দুর্দান্ত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তারা যে মন্দিরগুলো তৈরি করেছিলেন তা হিন্দু স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রাথমিক আধুনিক সময়কাল (আ. ১৫০০-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ)

[সম্পাদনা]

বিজয়নগর সাম্রাজ্য

[সম্পাদনা]

বিজয়নগর সাম্রাজ্য (কন্নড়: ವಿಜಯನಗರ ಸಾಮ್ರಾಜ್ಯ, Vijayanagara Sāmrājyaতেলুগু: విజయనగర సామ్రాజ్యము, Vijayanagara Sāmrājyamu) ছিল দক্ষিণ ভারতের একটি মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্য। পর্তুগিজরা এই সাম্রাজ্যকে বিসনাগা রাজ্য নামে অভিহিত করে। ১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে (প্রথম) হরিহর ও তার ভ্রাতা (প্রথম) বুক্কা রায় এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।[১৮৬] ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে দক্ষিণ ভারতে ইসলামি আক্রমণ প্রতিহত করে এই সাম্রাজ্য নিজস্ব প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।[১৮৭] ১৬৪৬ সাল পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। তবে ১৫৬৫ সালে দাক্ষিণাত্য সুলতানির নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এই সাম্রাজ্যের পতনের সূত্রপাত ঘটে। এই সাম্রাজ্য তার রাজধানী বিজয়নগরের নামে চিহ্নিত। বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের হাম্পিতে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে একটি বিশ্বঐতিহ্য স্থল। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় পর্যটক ডোমিনগো পেজফার্নাও নানস[১৮৮] ও নিকোলো ডি কন্টি প্রমুখের রচনা এবং স্থানীয় সাহিত্য থেকে এই সাম্রাজ্যের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। বিজয়নগরের শক্তি ও সমৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে।

এই সাম্রাজ্যের নিদর্শন স্বরূপ নানা স্থাপত্য ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্র দক্ষিণ ভারত জুড়ে। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন অবশ্যই হাম্পি। দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন মন্দির নির্মাণশৈলীগুলির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছিল বিজয়নগর স্থাপত্য। এর হিন্দু নির্মাণশৈলীর মধ্যে সকল ধর্মবিশ্বাস ও স্থানীয় শৈলীগুলির মিলন ঘটেছিল। স্থানীয় গ্র্যানাইট পাথরে এই শৈলী গড়ে ওঠে। ধর্মনিরপেক্ষ রাজকীয় স্থাপত্য নিদর্শনগুলিতে উত্তর দাক্ষিণাত্য সুলতানির প্রভাব সুস্পষ্ট। দক্ষ প্রশাসন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের কল্যাণে এই সাম্রাজ্যে জলসেচের নতুন প্রযুক্তি আমদানি করা সম্ভব হয়। বিজয়নগর সাম্রাজ্য শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিল। কন্নড়, তেলুগু, তামিল ও সংস্কৃত সাহিত্যে এই সাম্রাজ্যের পৃষ্টপোষকতায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়। কর্ণাটকী সংগীত এই সাম্রাজ্যের রাজত্বকালেই তার বর্তমান রূপটি লাভ করে। দক্ষিণ ভারতে ইতিহাসে হিন্দুধর্মকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সংহতি সাধনের মাধ্যমে বিজয়নগর সাম্রাজ্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

মারাঠা সাম্রাজ্য

[সম্পাদনা]

মারাঠা সাম্রাজ্য (মারাঠি: मराठा साम्राज्य) হল একটি ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য, যা খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী হতে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত (১৬৭৪ - ১৮১৮) ভারতবর্ষের প্রায় সমগ্র অংশ জুড়ে বিদ্যমান ছিলো। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মারাঠা সাম্রাজ্য পেশওয়ার অধীনে বহুগুণ বিস্তৃত হয়।বিস্তারের সর্বোচ্চ সময়ে এটি উত্তরে পেশোয়ার থেকে দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস হলে ভারতে শেষ হিন্দু সাম্রাজ্য হিসেবে মারাঠা সাম্রাজ্যকেই বিবেচনা করা হয়। ১৭৬১ সালে মারাঠারা পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে পরাজিত হয় যা উত্তর দিকে তাদের সাম্রাজ্যের বিস্তার রোধ করে।এর ফলে উত্তরভারত কার্যত কিছুদিন মারাঠা সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে যায়। যদিও ১৭৭০ সালে উত্তরভারত আবার মারাঠাসাম্রাজ্যের অধীনে আসে। পরবর্তীতে মারাঠা সাম্রাজ্য সম্রাটের অধীনে কেন্দ্রীয় ভাবে শাসিত হওয়ার পরিবর্তে পেশোয়াদের অধীনে বিভক্ত হয়ে যায় ও কনফেডারেসি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।১৮১৮ সালের মধ্যে ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে মারাঠা সাম্রাজ্য চূড়ান্ত পরাজয় স্বীকার করে।এর ফলেই কার্যত ভারতের উপর ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাম্রাজ্যের একটি বৃহৎ অংশ ছিল সমুদ্রবেষ্টিত এবং কানোজি আংরের মতো দক্ষ সেনাপতির অধীনস্থ শক্তিশালী নৌ-বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত। তিনি প্রতিপক্ষের, বিশেষত পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের নৌ-আক্রমণ সাফল্যের সাথেই প্রতিহত করেন।[১৮৯] সুরক্ষিত সমুদ্রসীমা এবং শক্তিশালী দুর্গব্যবস্থা মারাঠাদের সামরিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আধুনিক হিন্দু ধর্ম (১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের পরে)

[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ, যা বাংলার নবজাগরণ হিসেবেও পরিচিত, এটি বলতে বোঝায় ব্রিটিশ রাজত্বের সময় অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের জোয়ার ও বহু কৃতি মনীষীর আবির্ভাবকে। মূলত রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নবজাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন। ঊনবিংশ শতকের বাংলা ছিল সমাজ সংস্কার, ধর্মীয় দর্শনচিন্তা, সাহিত্যসাংবাদিকতা, দেশপ্রেম ও বিজ্ঞানের পথিকৃৎদের এক অন্যন্য সমাহার যা মধ্যযুগের অন্ত ঘটিয়ে এদেশে আধুনিক যুগের সূচনা করে।

স্বামী বিবেকানন্দ (বাংলা: [ʃami bibekanɒnɖo] (শুনুন)Shāmi Bibekānondo; ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ – ৪ জুলাই ১৯০২) নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত (বাংলা: [nɔrend̪ro nat̪ʰ d̪ɔt̪t̪o]), ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।[১৯০] অনেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন।[১৯১] ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন।[১৯২] বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।[১৯০] তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, "আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...,"[১৯৩] ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা,[১৯৩] যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।

ফ্রিডরিখ মাক্স মুলার (জার্মানFriedrich Max Müller) (জন্ম: ৬ই ডিসেম্বর, ১৮২৩ - মৃত্যু: ২৮শে অক্টোবর, ১৯০০) ছিলেন বিখ্যাত ভারতবিশারদদার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ, সমাজতত্ত্ববিদ, অধ্যাপক, সংস্কৃত ভাষায় সুপ্রসিদ্ধ জার্মান পণ্ডিত ও অনুবাদক। রুশ দার্শনিক আফ্রিকান আলেকসান্দ্রোভিচ স্পিরের ডেংকেন উন্ট ভির্কলিশকাইট ("চিন্তা ও বাস্তবতা") শিরোনামের লেখা তাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল।[১৯৪]

শ্রী অরবিন্দ বা অরবিন্দ ঘোষ (১৫ আগস্ট ১৮৭২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০) ভারতীয় বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, আধ্যাত্মসাধক এবং দার্শনিক[১৯৫][১৯৬] তার পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ এবং মাতামহ রাজনারায়ণ বসু। অরবিন্দ ঘোষ বাল্যকালে ইংল্যান্ডে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ট্রাইপস পাস করেন। দেশে ফিরে এসে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার অনুজ বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি কংগ্রেসের চরমপন্থী গ্রুপের নেতৃত্বে থাকাকালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে (১৯০৫–১৯১১) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন (তেলুগু ভাষায়: సర్వేపల్లి రాధాకృష్ణ; তামিল ভাষায়: சர்வேபள்ளி ராதாகிருஷ்ணன்), (৫ই সেপ্টেম্বর, ১৮৮৮ – ১৭ই এপ্রিল, ১৯৭৫) স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘The Reign of Religion in Contemporary Philosophy’প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে।

হিন্দু পুনর্জাগরণ

[সম্পাদনা]

অধিকাংশ হিন্দু সংস্কার আন্দোলনেরই সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। এই সকল আন্দোলনে প্রাচীন উপনিষদ ও বেদান্ত শাস্ত্রের এক নূতনতর ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয় এবং মনোযোগ দেওয়া হয় সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে।[১৯৭] এই সকল আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের তদনীন্তন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের পাশ্চাত্য শ্রেষ্ঠত্ব ও শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যের ধারণাকে খর্ব করা। এবং এই চেতনা থেকেই একটি দেশাত্মবোধক চেতনার সৃষ্টি হয়; যা থেকে জন্ম নয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আদর্শের।[১৯৮]

রাজা রামমোহন রায় প্রাচীন ঔপনিষদিক গ্রন্থগুলি থেকে একটি আধুনিক যুক্তিবাদী ভারতের চিত্রকল্প কল্পনা করেন।

স্বামীনারায়ণ ( ৩ এপ্রিল ১৭৮১ - ১ জুন ১৮৩০), সাহাজানন্দ স্বামী হিসাবেও পরিচিত, তিনি ছিলেন একজন যোগী এবং একজন সন্ন্যাসী, যার জীবন ও শিক্ষা কেন্দ্রীয় হিন্দু প্রথাগুলির ধর্ম, অহিংসা এবং ব্রহ্মচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি তার অনুসারীরা তাকে ঈশ্বরের পাঠানো দূত বলে বিশ্বাস করত।

১৭৮১ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের ছাপাইয়া গ্রামে স্বামীনারায়ণ জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৯২ সালে ১১ বছর বয়সে তিনি নীলকান্ত বর্নি নামটি গ্রহণ করে ১১ বছর বয়সে সাত বছরের তীর্থযাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রার সময় তিনি নানা কল্যাণমূলক কার্যক্রম করেন এবং এই যাত্রার ৯ বছর ১১ মাস পর তিনি ১৭৯৯ সালে গুজরাত রাজ্যে বসতি স্থাপন করেন। ১৮০০ সালে তিনি তার গুরু স্বামী রমানন্দ দ্বারা উদ্ভাব সম্প্রদায়ের সূচনা করেন এবং তাকে নাম দেওয়া হয় সাহাজানন্দ স্বামী। ১৮০২ সালে তার গুরু তার মৃত্যুর পূর্বে উদ্ভাব সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। সাহাজানন্দ স্বামী একটি আয়োজন করেন এবং "স্বামীনারায়ণ মন্ত্র" শিক্ষা দেন। এদিক থেকে তিনি স্বামীনারায়ণ নামে পরিচিত ছিলেন। উদ্ভাব সম্প্রদায় পরে স্বামীণারায়ন সম্প্রদায় নামে পরিচিতি পায়।

ব্রিটিশ রাজ্যের সাথে স্বামীনারায়ণ একটি ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার কেবল হিন্দু সম্প্রদায়েরই নয় বরং ইসলাম ও জরোস্ট্রিয়ানিজম এর অনেক অনুসারী ছিল। তিনি তার জীবদ্দশায় ছয়টি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এবং তার দর্শন বিস্তারের জন্য ৫০০ পরমহংস নিযুক্ত করেছিলেন। ১৮২৬ সালে, স্বামীনারায়ণ সামাজিক নীতির উপর একটি বই শিক্ষাপত্রি লিখেছিলেন। ১৮৩০ সালের ১ জুন তার মৃত্যু হয় এবং গুজরাতের গাধারায় হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাকে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যুর পূর্বে, স্বামীনারায়ণ তার স্বামীনারায়ণ সমপ্রদায়ের দুটি অংশের দায়িত্ব পরিচালনা করার জন্য গৃহীত ভাতিজাদেরকে আচার্য হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। নারী ও দরিদ্রদের জন্য সংস্কারের জন্য এবং ব্যাপকভাবে অহিংস (অগ্নি উৎসর্গ) সম্পাদন করার জন্যও সমাজের মধ্যে স্বামীমারায়নকে স্মরণ করা হয়।

ব্রাহ্মসমাজ বা ব্রাহ্মসভা ১৯ শতকে স্থাপিত এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন যা বাংলার পূনর্জাগরণের পুরোধা হিসেবে পরিচিত। কলকাতায় ২০ আগস্ট, ১৮২৮ সালে হিন্দুধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ও তার বন্ধুবর্গ মিলে এক সার্বজনীন উপাসনার মাধ্যমে ব্রাহ্মসমাজ শুরু করেন। তাদের উপাস্য ছিল "নিরাকার ব্রহ্ম", তাই থেকেই নিজেদের ধর্মের নাম রাখেন ব্রাহ্ম।

রামকৃষ্ণ পরমহংস রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৬ – ১৬ই আগস্ট, ১৮৮৬; পূর্বাশ্রমের নাম গদাধর চট্টোপাধ্যায়[১৯৯]) ঊনবিংশ শতকের এক প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি যোগসাধক[২০০], দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তার প্রচারিত ধর্মীয় চিন্তাধারায় রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন তার প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ[২০১][২০২][২০৩] তারা উভয়েই বঙ্গীয় নবজাগরণের[২০৪] এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর হিন্দু নবজাগরণের[২০৫][২০৬] অন্যতম পুরোধাব্যক্তিত্ব। তার শিষ্যসমাজে, এমনকি তার আধুনিক ভক্তসমাজেও তিনি ঈশ্বরের অবতাররূপে পূজিত হন।[২০৭]

রামকৃষ্ণ পরমহংস গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে পৌরোহিত্য গ্রহণের পর বঙ্গীয় তথা ভারতীয় শক্তিবাদের প্রভাবে তিনি কালীর আরাধনা শুরু করেন।[১৯৯] তার প্রথম গুরু তন্ত্র ও বৈষ্ণবীয় ভক্তিতত্ত্বজ্ঞা এক সাধিকা। পরবর্তীকালে অদ্বৈত বেদান্ত মতে সাধনা করে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন রামকৃষ্ণ। অন্যান্য ধর্মীয় মতে, বিশেষত ইসলাম ও খ্রিস্টীয় মতে সাধনা তাকে “যত মত, তত পথ” উপলব্ধির জগতে উন্নীত করে।[১৯৯] পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক গ্রামীণ উপভাষায় ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে প্রদত্ত তার ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণ জনমানসে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে অশিক্ষিত হলেও রামকৃষ্ণ বাঙালি বিদ্বজ্জন সমাজ ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্ভ্রম অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৭০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দু পুনর্জাগরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তৎসঙ্গে সংগঠিত করেন একদল অনুগামী, যাঁরা ১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর সন্ন্যাস গ্রহণ করে তার কাজ চালিয়ে যান। এঁদেরই নেতা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ[২০৮]

১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় বিবেকানন্দ তার ধর্মীয় চিন্তাধারাকে পাশ্চাত্যের জনসমক্ষে উপনীত করেন। বিবেকানন্দ যে বিশ্বমানবতাবাদের বার্তা প্রেরণ করে তা সর্বত্র সমাদৃত হয় এবং তিনিও সকল সমাজের সমর্থন অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু দর্শনের সার্বজনীন সত্য প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এরপর প্রতিষ্ঠা করেন বেদান্ত সোসাইটি এবং ভারতে রামকৃষ্ণের ধর্মীয় সমন্বয়বাদ ও “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”র আদর্শ বাস্তবায়িত করার জন্য স্থাপনা করেন রামকৃষ্ণ মিশন নামে একটি ধর্মীয় সংস্থা।[২০৮] রামকৃষ্ণ আন্দোলন ভারতের অন্যতম নবজাগরণ আন্দোলনরূপে বিবেচিত হয়।[২০৯] ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভারত ও বহির্ভারতে রামকৃষ্ণ মিশনের মোট ১৬৬টি শাখাকেন্দ্র বিদ্যমান। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার বেলুড় মঠে অবস্থিত।[২১০]

আর্য সমাজ (Sanskritआर्य समाजইংরেজিārya samāja "Noble Society") বৈদিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য স্বামী দয়ানন্দ কর্তৃক ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি হিন্দু সংগঠন ও সংস্কার আন্দোলন[২১১] তিনি একজন বেদ প্রচারক সন্ন্যাসী ছিলেন। তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। এই আদর্শের উপর জোর দিয়েছিলেন। আর্য সমাজের সদস্যগণ এই নীতিই মেনে চলেন। তারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ তারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং মূর্তিপূজার বিরোধী।[২১২] তাদের বিশ্বাস বেদোক্ত ব্রহ্মের উপর ।


পশ্চিমে অভ্যর্থনা

[সম্পাদনা]

সমসাময়িক হিন্দু ধর্ম

[সম্পাদনা]

হিন্দু সংস্কার আন্দোলনের অধিকাংশেরই সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। এই সকল আন্দোলনে প্রাচীন উপনিষদ ও বেদান্ত শাস্ত্রের এক নূতনতর ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয় এবং মনোযোগ দেওয়া হয় সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে। [১৯৭] এই সকল আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের তদনীন্তন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের পাশ্চাত্য শ্রেষ্ঠত্ব ও শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যের ধারণাকে খর্ব করা। এবং এই চেতনা থেকেই একটি দেশাত্মবোধক চেতনার সৃষ্টি হয়; যা থেকে জন্ম নয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আদর্শের। [১৯৮]

পশ্চিমে নব্য-হিন্দু আন্দোলন

[সম্পাদনা]

পরমহংস যোগানন্দ (Pôromohôngsho Joganondo, সংস্কৃত : परमहंस योगानं‍द Paramahaṃsa Yogānaṃda; জন্ম: জানূয়ারি ৫, ১৮৯৩ - মৃত্যূ: মার্চ ৭ ১৯৫২) একজন ভারতীয় যোগী এবং গুরু। তিনি তার রচিত বই অটোবায়োগ্রাফি অফ এ যোগীর মাধ্যমে পাশ্চাত্য সমাজকে ধ্যান এবং ক্রিয়া যোগের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (ইংরেজি: Abhay Charanaravinda Bhaktivedanta Swami Prabhupada, সংস্কৃতअभय चरणारविन्द भक्तिवेदान्त स्वामी प्रभुपादःIASTabhaya-caraṇāravinda bhakti-vedānta svāmī prabhupāda) (১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৬  – ১৪ নভেম্বর, ১৯৭৭) ছিলেন একজন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মগুরু এবং ইসকন বা হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের[২১৩] প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য।[২১৪] তিনি নিজে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতীর শিষ্য ছিলেন। হিন্দুধর্মের গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদটি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার জীবনের উদ্দেশ্য।[২১৫]

হিন্দুত্ব

[সম্পাদনা]

হিন্দুত্ব (দেবনগরী: हिन्दुत्व, "Hinduness") হল হিন্দুদের কর্তৃত্ব এবং জীবন ধারণে হিন্দু রীতিনীতি অবলম্বনের লক্ষ্যে পদক্ষেপসমূহ। হিন্দুত্ব শব্দে কোন উপাসনা পদ্ধতি কে বোঝায় না। এটি একটি জীবনশৈলী। একটি সংস্কৃতি যা এদেশে যুগ যুগান্তর ধরে প্রচলিত আছে।।[২১৬] হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক বিনায়ক দামোদর সাভারকর, ’হিন্দুত্ব' শব্দটির উদ্ভাবন করেন একথা সর্বৈব ভ্রান্ত। ভারতের প্রতিটি সন্তান রাষ্ট্রীয়তার দৃষ্টিতে হিন্দু। তাই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র। এদেশের জনগনের মধ্যে রাষ্ট্রভক্তি, নৈতিকতা, সচ্চরিত্রতা, সদাচার, ধর্মনিষ্ঠাতা (চিরন্তন সত্যনিষ্ঠতা) ও প্রতিকারপরায়ণতা ইত্যাদি গুণাবলির বিকাশকরে; সংগঠিত সশক্ত জাগ্রত সমাজের দ্বারা এদেশের রাষ্ট্রোত্থান সম্ভব। এবং তার দ্বারা জগৎ কল্যাণ সাধিত হবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও বিশ্বাস করে যে এদেশের মানুষের নিজস্ব উপাসনা পদ্ধতির স্বতন্ত্রতা, খাদ্যাভ্যাস ও প্রধানের স্বতন্ত্রতা, বিচার ও চিন্তন এর স্বতন্ত্রতা ইত্যাদির বিবিধতার মধ্যে এদেবের চিরন্তন একাত্মতাই হিন্দুত্ব। এদেশের পবিত্রতার ধারনার সাথে যুক্ত তিনিই হিন্দু। যিনি এদেশের ভূমি, নদ নদী, পাহাড় পর্বত, প্রাণ ও উদ্ভিদ সকল কে, তীর্থরাজি, পতিত্র গ্রন্থরাজিকে সম্মান করেন ভালো বা এন নিজের মনে করেন তিনিই হিন্দু। এই হিন্দুত্ব পারে বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে। সমগ্রবিশ্বকে লালন করতে পালন করতে।

Comments